বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালির আরেক দফা বিজয় হয়। প্রেসিডেন্ট জে: মো: আইযুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদ থেকে বিদায় নেয়। সামরিক জান্তা জে: আইযুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরা মহাকুমার প্রতাপনগর ও আনুলিয়া ইউনিয়নে বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শনের অনুকূলে রাজনীতির হাওয়া বইতে থাকে। স্বল্প পরিসরে হলেও আনুলিয়া ইউনিয়নের নাংলা গ্রামের মরহুম আব্দুল ওহাব মোল্লা (পরবর্তীতে আনুলিয়া ইউপির চেয়ারম্যান) এবং প্রতাপনগর ইউনিয়নের কল্যাণপুর গ্রামের মরহুম আব্দুস সামাদ সানা ও মরহুম মতিয়ার রহমান তরফদার (পরবর্তীতে প্রতাপনগর ইউপির চেয়ারম্যান) বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শনের স্থানীয় কর্ণধার হয়ে ওঠেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে তারাই পুরোধা হিসেবে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে খুলনা-৭ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এ্যাড. আব্দুল গফফার এবং একই সংগঠনের মনোনয়নে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের খুলনা-১০ আসন থেকে পীরজাদা আবু সাঈদ নির্বাচিত হন। নির্বাচনে অভূতপূর্ব বিজয়ের পর আব্দুল ওহাব মোল্লার নেতৃত্বে আনন্দ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বল্লবপুর, মনিপুর ও ভোলানাথ গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে আব্দুস সাত্তার, স ম রুহুল আমীনসহ অন্যান্যরা অংশ নেয়। নির্বাচনোত্তর পাকিস্তানী সামরিক জান্তা আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করে। তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি স্বাধীনতার প্রশ্নে বজ্র কঠিন শপথ গ্রহণ করে। দেশব্যাপী স্লোগান উচ্চারিত হয় ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।
বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল প্রেক্ষাপট ১৯৭১। বছরটি জাতির গর্বের, জাতির অহঙ্কারের। স ম রুহুল আমিন একাত্তরে ১৮ বছর বয়সী টগবগে যুবক। আশাশুনি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এ যুবকের হৃদয়ে প্রতিরোধের মানসিকতা গড়ে ওঠে।
সাতক্ষীরার অজোপাড়া গাঁ বিছট গ্রামের সন্তান, খোলপেটুয়া নদীর তীরে পৈত্রিক ভিটে। প্রশাসনিক ভাবে আশাশুনি উপজেলার অধীনে। জন্মেছেন ১৯৫৩ সালের ১ এপ্রিল। মৃত কওসার আলী সানা তার পিতা আর আমেনা খাতুন মা। একাত্তরের ফেব্রুয়ারি থেকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভাষণে ২৩ বছরে বাঙালির ওপর শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ৮ মার্চ সকালে নিজ গ্রাম বিছটের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ী বাঁধের ওপর বসে ঐতিহাসিক এ ভাষণ শোনেন।
এ ভাষণ তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে অনুপ্রেরণা যোগায়। মায়ের কোল ছেড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের বশিরহাট মহাকুমার তকিপুর ইযুথ ক্যাম্পে যোগ দেন। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় তাদের প্রশিক্ষণ। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ দিতেন। এ সময় আনুলিয়া ইউনিয়নের সন্তান ফজলুল হক, আব্দুস সাত্তান সর্দারও বশির আহম্মেদসহ প্রমুখরা এখানে প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে পাইকগাছার হেতালবুনিয়া ক্যাম্পে যোগ দেন। এ ক্যাম্পে ৭ দিন প্রশিক্ষণ হয়। আগস্ট মাসে বি এল কলেজের তৎকালীন ভিপি ও মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক অধিনায়ক স ম বাবর আলীর নির্দেশনায় আনুলিয়া ইউনিয়নে গড়ে ওঠা বল্লবপুর গ্রামে শেরে বাংলা ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেন। এ ক্যাম্পে নেতৃত্বে ছিলেন প্রথম পর্যায়ে পাইকগাছা থানার অন্তাবুনিয়া গ্রামের জি এম রেজাউল করিম, দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রতাপনগর গ্রামের মরহুম মতিউর রহমান ও তৃতীয় পর্যায়ে পাইকপাড়া গ্রামের জিএম মোসলেম ক্যাম্প কমা-ার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন।
প্রথম দিককার ক্যাম্প কমা-ার রেজাউল করিম, জি এম মোসলেমসহ ১২জন যোদ্ধা নদী পথে শত্রুদের নজরদারী করতে নৌযান যোগে টহল দিতেন। শেরে বাংলা ক্যাম্পে তার সহযোদ্ধারা হচ্ছেন প্রতাপনগর গ্রামের মো: মতিউর রহমান, বল্লবপুর গ্রামের আব্দুল হাকিম, মির্জাপুর গ্রামের সামছুদ্দিন মোড়ল, পাইকপাড়া গ্রামের জি এম মোসলেম, গোলাম কুদ্দুস গাজী, রাজাপুর গ্রামের সফেদ আলী খান, মধ্যম একসরা গ্রামের আব্দুস সামাদ সানা, শিরষা গ্রামের বনি আদম মোড়ল, আনুলিয়া ইউনিয়নের আব্ বক্কর গাজী, মোক্তার হোসেন মোড়ল, মোকছেদ মোড়ল ও আব্দুস সাত্তার কারিকর প্রমুখ। ডিসেম্বরে খুলনায় পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয়ের কথা খুলনার রণাঙ্গনে বসেই তিনি শোনেন।
১৬ ডিসেম্বরে জাতির বিজয় তার জীবনের বড় অর্জন। স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে তিনি বলেন, বিজয় বেশে বিছট গ্রামে ফিরলে স্বজনরা তাকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করে। যুদ্ধ জীবনে জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার, মেধা ও শ্রম দিয়ে লাল-সবুজের পতাকা জয় করার জন্য এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার জন্য বীরোচিত ভূমিকার জন্য তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য এম এ গফুর, মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান স ম বাবর আলী, জি এম রেজাউল করিম, মতিউর রহমান, জি এম মোসলেম ও লুৎফর রহমান তরফদারের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বসুুদেবপুর গ্রামের আবু বক্কর কারিকর, বিছট গ্রামের নুর আহম্মেদ মোল্লা, খাদেমুল ইসলাম মোল্লা ও মণিপুর গ্রোমের শাহমত আলী সানা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বীর যোদ্ধার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।